Home অপরাধ রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎ প্রকল্পে নতুন ষড়যন্ত্রে ড. জাহেদুল

রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎ প্রকল্পে নতুন ষড়যন্ত্রে ড. জাহেদুল

by News Desk
০ comment

পাবনার ঈশ্বরদীতে নির্মাণ হচ্ছে জাতির আশার প্রদীপ রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র। অনেক আকাঙ্ক্ষার কর্মসূচি হলেও পিছু ছাড়ছে না বিতর্ক। আওয়ামী আমলে লুটপাটের অন্যতম আখড়ায় পরিণত হয় এ প্রকল্প। সে সরকার ক্ষমতাচ্যুত হলেও রয়ে গেছেন তাদের নিয়োগ দেওয়া কর্মকর্তারা। তাদের মধ্যে প্রকল্প পরিচালক এবং নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ড. জাহেদুল হাছান দানব হয়ে উঠেছেন।

অনিয়ম-দুর্নীতিতে আকণ্ঠ ডুবে থাকলেও এসব নিয়ে যে-ই কথা বলেন, তাকেই তিনি পদ থেকে সরিয়ে দেন। কারণে অকারণে যান বিদেশ ভ্রমণে। রাজধানীর বনানীতে কয়েক কোটি টাকার ফ্ল্যাটসহ গড়েছেন বিপুল সম্পদ।

জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ইয়াফেস ওসমানের সরাসরি হস্তক্ষেপে ২০২৪ সালে প্রকল্প পরিচালক হন ড. জাহেদুল। সেই থেকে তার স্বেচ্ছাচারী, বৈষম্যমূলক ও ফ্যাসিবাদী আচরণে অতিষ্ঠ প্রকৌশলীরা। এর পর তিনি এনপিসিবিএলের এমডির পদ বাগিয়ে নেন। দেশের গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর এ প্রকল্প দেখভাল করার জন্য গঠন হয়েছে এনপিসিবিএল। সে হিসেবে নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর প্রথমে কয়েক বছর প্রশিক্ষণ ও পরে পুরো বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি পরিচালনা করবে নিয়ে তারা ইতোমধ্যে সেবা দিচ্ছেন। কিন্তু ধীরে ধীরে নানা অজুহাতে দেশি প্রকৌশলীদের সেখান থেকে সরিয়ে বড় ষড়যন্ত্রের ছক কষছেন ড. জাহেদুল। তিনি কোম্পানিটিকে অকার্যকর ও ব্যর্থ দেখিয়ে রাশিয়ার একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করতে চাচ্ছেন, যেটি নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর প্রকল্পটি পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করবে। এ ছাড়া দেশের স্পর্শকাতর এ প্রকল্পের নানা তথ্য ভারতে পাচার করার জন্য ভারতীয় হাইকমিশনের হয়ে কাজ করেন, এমন লোকদের নিয়োগ দেন এবং তাদের যেকোনো তথ্যে অবাধ প্রবেশাধিকার দেন। এসব নিয়ে কথা বললেই সাসপেন্ড (সাময়িক বরখাস্ত) ও শোকজ (কারণ দর্শানোর নোটিস) করেন।

এনপিসিবিএলের সিনিয়র সহকারী ব্যবস্থাপক ফাহিম শাহরিয়ার তুহিন সম্প্রতি সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ড. জাহেদুলের বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়ম, চরম অযোগ্যতা, দুর্নীতি, প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক ফ্যাসিবাদের অভিযোগে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে। তিনি গুরুত্বপূর্ণ এ প্রকল্পকে রীতিমতো মগের মুল্লুক বানিয়েছেন। এজন্য তিনি দখল করে রেখেছেন প্রকল্প পরিচালক, এনপিসিবিএলের এমডি, প্রধান মানবসম্পদ কর্মকর্তা, প্রধান অর্থ ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা, স্টেশন ডিক্টেরসহ সব গুরুত্বপূর্ণ পদ।

তিনি আরো বলেন, প্রায় এক দশক আগে এনপিসিবিএল গঠন হলেও কোনো সার্ভিস রুল প্রকাশ করা হয়নি। ফলে নেই কোনো অর্গানোগ্রাম, দায়িত্বের সুস্পষ্ট বণ্টন, পদোন্নতির বিষয়ে নেই কোনো নীতিমালা। বরং জেঁকে বসেছে একগুচ্ছ গ্রেড ও বেতন বৈষম্য এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। বছরের পর বছর প্রভিডেন্ড ফান্ডের নামে প্রতি মাসে টাকা জমা রাখা হয় কিন্তু এতদিনেও কোনো কর্মকর্তাকেই তার অ্যাকাউন্ট নাম্বার জানানো হয়নি। এমনকি এ টাকা কোথাও বিনিয়োগ করা হয়নি। বাংলাদেশের কোম্পানি আইনের ব্যাপারে সুস্পষ্ট জ্ঞান না থাকা একজন অযোগ্য ব্যক্তির অদক্ষতার কারণে হাজার হাজার মেধাবী কর্মকর্তা-কর্মচারীর ভবিষ্যৎ আজ হুমকির মুখে। এক দশক পেরিয়ে গেলেও এনপিসিবিএলের প্রায় এক হাজার ৮০০ কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে দেড় হাজার জনের জন্য এখনো প্রকল্প এলাকায় ন্যূনতম বসার ব্যবস্থা, টয়লেট, স্বাস্থ্য ও সুরক্ষা ব্যবস্থার মতো অতিজরুরি বিষয় নিশ্চিতকরণেও কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই এমডির।

কর্মকর্তারা অভিযোগ করেন, প্রকল্পে বাঙালিদের খাবার উপযুক্ত একমাত্র ক্যান্টিনটিও বন্ধ করে দিয়েছেন ড. জাহেদুল। এর পেছনে রয়েছে তার অবৈধ টেন্ডার বাণিজ্য। মেডিকেল ইমার্জেন্সিসহ যেকোনো অতিজরুরি বিষয়েও কর্মকর্তাদের পাসপোর্ট ইস্যু করেন না তিনি। বন্ধ করে দিয়েছেন পবিত্র ওমরাহ করার সুযোগ এবং হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের জন্য যেকোনো তীর্থস্থান ভ্রমণ।

কর্মকর্তারা জানান, সুযোগ-সুবিধা ও সার্ভিস রুলস নিয়ে গত সেপ্টেম্বরে ড. জাহেদুলের সঙ্গে দেখা করলে তিনি বিষয়গুলো সমাধানের আশ্বাস দেন। এরপর কোনো দাবি পূরণ না করে উল্টো সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পেছনে লাগেন তিনি। একের পর একেকজনকে প্রকল্প এলাকায় প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা, সাসপেন্ডসহ নানা হয়রানি করে আসছেন তিনি। আর কোনো কাজ মনঃপুত না হলেই চাকরি ছেড়ে চলে যেতে বলেন, অমানবিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেন। তার স্বেচ্ছাচারিতা ও অসদাচরণের কারণে রাশিয়া থেকে প্রশিক্ষণ পাওয়া অনেকেই চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। সম্প্রতি শতাধিক প্রকৌশলী ইস্তফা দিয়েছেন। চাকরি ছেড়ে গেলেও সিপিএফ, গ্র্যাচুইটি, অভিজ্ঞতা সনদ, এনওসিÑ কিছুই দেওয়া হয়নি তাদের।

ভুক্তভোগীরা জানান, ড. জাহেদুল ক্ষমতার অপব্যবহার করে গত বছরের আগস্ট মাস থেকে দফায় দফায় ২৫ জনের বেশি কর্মকর্তা এবং সর্বশেষ গত ২৯ এপ্রিল ৯ জনের প্রকল্পে প্রবেশাধিকার কেড়ে নেন। কিন্তু এর দায় চাপিয়েছেন সেনাবাহিনীর ওপর। তার অব্যবস্থাপনা ও স্বেচ্ছাচারিতার জন্য সুনাম ক্ষুণ্ণ হচ্ছে স্বশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের।

তারা আরো বলেন, সম্প্রতি সাইটের চিফ ইঞ্জিনিয়ার হাসমত আলী এসব অব্যবস্থাপনা ও অসঙ্গতি নিয়ে কথা বলার জন্য এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়ে ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন গঠন করার জন্য উদ্যোগ নিলে তাকে একাধিকবার শোকজ ও স্ট্যান্ড রিলিজ দিয়ে ঢাকায় নিয়ে যান ড. জাহেদুল। এ ছাড়া আরো তিন শতাধিক কর্মকর্তাকে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন কারণ দেখিয়ে স্ট্যান্ড রিলিজ, সর্তকর্তা ও কারণ দর্শানোর নোটিস দিয়েছেন, যা কোম্পানির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অস্থিরতা তৈরি করেছে।

জানা গেছে, আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে একটি সার্ভিস রুল দেওয়া হয়েছে, যেখানে কোনো সুযোগ-সুবিধা বা নিয়োগনীতি ও ক্যারিয়ার পাথ উল্লেখ না থাকলেও কী কী উপায়ে শাস্তি দেওয়া যায়, সেসব তুলে ধরা হয়েছে। আবার এ সার্ভিস রুলে বোর্ড সদস্যদের সই নেই।

প্রকৌশলীরা অভিযোগ করে বলেন, এ প্রকল্পে ড. জাহেদুলের চর হিসেবে কাজ করেন সহকারী প্রকল্প পরিচালক অলক চক্রবর্তী। ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর এজেন্ট হিসেবে পরিচিত এ প্রশাসনিক কর্মকর্তা প্রকল্প এলাকায় অস্থিরতা তৈরিতে ইন্ধন জোগান। মানবিক বিভাগ থেকে পাস করা এ কর্মকর্তা নিয়োগ পান ভারতীয় হাইকমিশন ও আওয়ামী লীগের মন্ত্রী ইয়াফেস ওসমানের সুপারিশে। তিনি প্রকল্পের বিষয়ে ন্যূনতম জ্ঞান না রাখলেও মূলত ভারতে তথ্য পাচারের দায়িত্ব পালন করেন।

ভুক্তভোগী উপসহকারী ব্যবস্থাপক রুবেল হোসেন বলেন, ‘ড. জাহেদুলের অপসারণসহ বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করায় আমাদের ২৬ প্রকৌশলীকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।’

অভিযোগের বিষয়ে জানতে ড. জাহেদুলের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি।

You may also like

Leave a Comment