Home আন্তর্জাতিক এশিয়ায় ‘গুজরাটের কসাই’ নামে পরিচিতি পান মোদি।

এশিয়ায় ‘গুজরাটের কসাই’ নামে পরিচিতি পান মোদি।

by News Desk
০ comment

নরেন্দ্র মোদির রাজনৈতিক উত্থান ঘটে আরএসএস নামক হিন্দুত্ববাদী চরমপন্থি সংগঠনের হাত ধরে। ২০০১ সালে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরই নরেন্দ্র মোদি গুজরাটকে ঘৃণার পরীক্ষাগারে পরিণত করেন।

২০০২ সালের ফেব্রুয়ারিতে গোধরা-কাণ্ডের পর গুজরাটে শুরু হয় ভারতের ইতিহাসের অন্যতম নিকৃষ্ট এক দাঙ্গা। দুই হাজারেরও বেশি মুসলমান পুরুষ নিহত ও গণধর্ষণের শিকার হন অনেক মুসলিম নারী। মুসলিম সম্প্রদায়ের ঘরবাড়ি সহায়-সম্পদ পুড়িয়ে ছাই করা হয়। প্রশাসন কোথাও নীরব, কোথাও সহায়ক! এই নৃশংসতার মাধ্যমেই এশিয়ায় ‘গুজরাটের কসাই’ নামে পরিচিতি পান মোদি।

গুজরাটে মোদি ক্ষমতায় বসার পর মুসলিমদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে রাষ্ট্রীয় বৈষম্য ও নিপীড়ন শুরু হয়। বিলকিস বানুর ঘটনা সেই বর্বরতারই একটি জ্বলন্ত উদাহরণ। গুজরাট দাঙ্গার সময় পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা বিলকিসকে ১১ জন হিন্দু সন্ত্রাসী মিলে গণধর্ষণ করে। বিলকিস বানুর সঙ্গে গণধর্ষণ করা হয় তার মাকেও। বিলকিস বানুর তিন বছরের শিশুকন্যাকে পাথর দিয়ে মাথা থেঁতলে হত্যা করা হয়। নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় বিলকিস বানুর পরিবারের আরো ১৪ জনকে। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ে সাময়িক গ্রেপ্তার দেখানো হলেও, ২০২২ সালে মুক্তি দিয়ে ফুলমালায় বরণ করা হয় হত্যাকারী ও ধর্ষকদের! ২০০২ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত মোদি গুজরাটে মুসলিমদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বয়কট সুসংগঠিত করে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রশাসন সবখানেই মুসলিমবিদ্বেষের অদৃশ্য প্রাচীর গড়ে তোলা হয়।
২০১৩ সালে বিজেপি তাকে প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী ঘোষণা করলে পুরো দেশে বিভাজনের বিষ ছড়িয়ে পড়ে। নির্বাচনী প্রচারণায় ‘গুজরাট মডেল’কে বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি করা হয়, যার বাস্তবতা ছিল বৈষম্য, দাঙ্গা ও মুসলিম সম্প্রদায়ের রক্তের হোলি খেলার নির্মম ইতিহাস। ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর গো-মাংসসংক্রান্ত গুজবকে অস্ত্র করে মুসলিম নিধনের এক নতুন অধ্যায় শুরু হয়। আখলাক, রাজস্থানে পেহলু খান, ঝাড়খণ্ডে আলিমুদ্দিন আনসারী গণপিটুনিতে নির্মমভাবে নিহত হন। তাবরেজ আনসারীকে ‘জয় শ্রীরাম’ বলতে বাধ্য করে হত্যা করা হয়। উত্তর প্রদেশে কাসিম কুরেশি, আসামে আবুল হুসেইন ও শামসুল হক—সবাই এই ঘৃণার রাজনীতির বলি হন।

যোগী আদিত্যনাথের উত্তর প্রদেশের গেরুয়া সন্ত্রাস মুসলিম নিপীড়নের আরো নির্মম অধ্যায় সূচনা করে। হিজাব নিষিদ্ধ করা হয়, মাদরাসাশিক্ষার ওপর লাগাম টানা হয়, মুসলিম পোশাক ও নামধারীদের প্রতি সন্দেহের চোখ আরো শানিত হয়। ‘লাভ জিহাদ’ নামক কাল্পনিক গল্প তৈরি করে মুসলিম যুবকদের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ অভিযান চালানো হয়। মুসলিম ব্যবসায়ীদের বয়কট, আজানের ওপর নিষেধাজ্ঞা, গোরক্ষকদের নামে খুনের উন্মাদনা—সবকিছুই রাষ্ট্রীয় বৈষম্যে পরিণত হয়।

২০১৮ সালে আসামের এনআরসি আতঙ্ক পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা এবং দেশের অন্যান্য রাজ্যেও ছড়িয়ে পড়ে। ২০১৯ সালে সিএএ আইন পাস করে ধর্মভিত্তিক নাগরিকত্ব প্রদানের বৈষম্য স্থাপন করা হয়। দেশজুড়ে প্রতিবাদে উত্তাল মুসলিম তরুণদের ওপর চালানো হয় পুলিশি নির্যাতন ও হত্যা। আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়, জামিয়া মিল্লিয়াসহ দেশের বড় মাপের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও রক্তাক্ত হয় নির্যাতনের হিংস্রতায়। ২০২০ সালের দিল্লি দাঙ্গায় প্রশাসনের ছত্রছায়াতেই বিভিন্ন মুসলিমপাড়া আগুনে পুড়িয়ে ধ্বংস করে দেওয়া হয়। বিভিন্ন মসজিদে আগুন আর মুসলিমদের ধরে ধরে হত্যা করা হয়।

কাশ্মীরও মোদি সরকারের নীলনকশার শিকার হয়। ৩৭০ অনুচ্ছেদ বিলোপ করে কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা কেড়ে নেওয়া হয়। কাশ্মীরের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাল্টানোর জন্য সেখানে হিন্দুদের বসতি স্থাপনের ব্যবস্থা করা হয়। ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা প্রতিবাদ দমনে ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন করে মাসের পর মাস পুরো উপত্যকাকে জেলখানায় পরিণত করা হয়। হাজার হাজার মুসলিম যুবককে বিনাবিচারে আটক করা হয়। বন্দুকের নল উঁচিয়ে দখলদারি প্রতিষ্ঠিত হয়।

২০২৩ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত মুসলিম নিপীড়নের মাত্রা আরো ভয়াবহ রূপ নেয়। কর্ণাটকে হিজাব নিষিদ্ধ করা হয়। আসামে সরকারি মদতে একের পর এক মাদরাসা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। উত্তর প্রদেশে বুলডোজার চালিয়ে মুসলিম বসতি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। ধর্মীয় মিছিলের নামে মুসলিমপাড়ায় হামলা ও দাঙ্গা উসকে দেওয়া হয়। ছড়িয়ে পড়ে সাম্প্রদায়িক উন্মাদনা। পাঠ্যপুস্তকে ইতিহাস বিকৃত করে মুসলিম শাসকদের ‘বিদেশি আক্রমণকারী’ বলে অপমান করা হয়, মুঘল সাম্রাজ্যের শিল্প, সংস্কৃতি ও অবদান মুছে ফেলার চেষ্টা চলে। শিবাজী ও গডসের মতো চরিত্রকে নায়ক বানানো হয়, শাহজাহান, আওরঙ্গজেবের মতো ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের দানবের আসনে বসানো হয়।

মিডিয়ার বড় অংশ সরকারি প্রোপাগান্ডার যন্ত্রে পরিণত হয়। ইসলামফোবিয়া ছড়িয়ে গণচেতনাকে বিষাক্ত করা হয়। মুসলিম জনগোষ্ঠী পরিণত হয় ভারতীয় গণতন্ত্রের নির্যাতিত শ্রেণিতে।

You may also like

Leave a Comment